ঢাকা ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি ::
আমাদের নিউজপোর্টালে আপনাকে স্বাগতম... সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে...

শিল্পে তীব্র গ্যাস–সংকট, দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তারা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৪ ২০ বার পড়া হয়েছে

বেলা সাড়ে ১১টা। এম এস ডাইং, প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানার ডাইং ইউনিটের অধিকাংশ বৈদ্যুতিক বাতিই বন্ধ। ফলে তৈরি হয়েছে কিছুটা আলো-আঁধারি পরিবেশ। দৈত্যকার যন্ত্রগুলোও চুপচাপ। শ্রমিকেরা আসেন, তবে কাজ নেই। অলস সময় কাটান তাঁরা। অথচ দিনের এই সময়ে টনে টনে নিট কাপড় রং করতে যন্ত্রগুলোর সঙ্গে শ্রমিকেরা সাধারণত মহাব্যস্ত সময় পার করেন।

গ্যাস-সংকটের কারণে ৯ দিন ধরে এই কারখানায় পুরোপুরি নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক কবীর আহমেদ। তিনি জানান, দিনে ১১০ টন কাপড় ডাইংয়ের সক্ষমতা থাকলেও গত তিন মাস গ্যাস-সংকটের কারণে ৮০ থেকে ৮৫ টনের মতো কাপড় রং করা গেছে। কিন্তু ৮ জানুয়ারি থেকে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। ফলে টানা ৯ দিন ধরে কাপড় ডাইং বন্ধ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরীর এম এস ডাইং, প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানার মতো এই জেলার প্রায় সাড়ে চার শ শিল্পকারখানা বছরের শুরু থেকে তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি আরও দুই শিল্প এলাকা সাভার ও গাজীপুরের শ্রীপুরেও একই পরিস্থিতি। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে এসব এলাকার ডাইং কারখানা, সুতার কল বা স্পিনিং মিল, খাদ্যপণ্য, কাগজকলসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সেই তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে হবিগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহের ভালুকা ও চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলো। চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস পেলেও উৎপাদন মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারছে তারা।

এতে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানা বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয় করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। গ্যাসের এই সংকট শিগগিরই সমাধান না হলে শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের মতো ঘটনা বাড়বে বলে জানালেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। মোটামুটি ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পেলেও বড় ধরনের সংকট হয় না। কিন্তু এ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায় না। দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এলএনজি আনা হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই এখন দিনে ২৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে গ্যাসের সরবরাহ। দেখা গেছে, সরবরাহ কমলে নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার শিল্পকারখানা বেশি সংকটে পড়ে।

জানতে চাইলে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস-সংকট চরম অবস্থায় চলে গেছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার; গাজীপুরের শ্রীপুর ও সাভার এলাকায় সংকট বেশি। এসব এলাকার ডাইং কারখানাগুলো বেশি ভুগছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্যাস সমস্যা নিয়ে পেট্রোবাংলা কিংবা তিতাসের উচ্চপর্যায়ের কেউ কোনো কথা বলে না। এখন কাউকে ফোন দিলেও পাওয়া যায় না। বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত।’

সরেজমিন নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরে ফেয়ার অ্যাপারেলস নামের পোশাক কারখানার ভবনের নিচে ১৪টি বড় এলপিজি সিলিন্ডার বসানো হয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলতে থাকায় কারখানার আয়রন চালাতে এমন ব্যবস্থা করে নিয়েছে মালিকপক্ষ। যদিও গ্যাস-সংকটের কারণে তাদের ডাইং ইউনিটের উৎপাদন ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

ফেয়ার অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ডাইং ইউনিটে দিনে ৩০ টন কাপড় ডাইং করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু গ্যাস-সংকটের কারণে ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি ডাইং করতে পেরেছি যথাক্রমে ৭, ৬ ও ৭ টন। রাতে অল্প গ্যাস ও ডেসার বিদ্যুৎ ব্যবহারে এটুকু উৎপাদন করা যাচ্ছে। অথচ বর্তমানে আমাদের পোশাক কারখানায় প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ টন কাপড় দরকার।’

মোহাম্মদ কাশেম আরও জানান, এই গ্যাস-সংকটের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-সংকট চলছে। কখনো কম, কখনো বেশি। ফলে সক্ষমতা অনুযায়ী তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ নেওয়া যাচ্ছে না। আর কাজ না থাকায় গত ছয় মাসে অন্তত ৫০০ কর্মীকে বাদ দিতে হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শিল্পে তীব্র গ্যাস–সংকট, দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তারা

আপডেট সময় : ১১:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৪

বেলা সাড়ে ১১টা। এম এস ডাইং, প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানার ডাইং ইউনিটের অধিকাংশ বৈদ্যুতিক বাতিই বন্ধ। ফলে তৈরি হয়েছে কিছুটা আলো-আঁধারি পরিবেশ। দৈত্যকার যন্ত্রগুলোও চুপচাপ। শ্রমিকেরা আসেন, তবে কাজ নেই। অলস সময় কাটান তাঁরা। অথচ দিনের এই সময়ে টনে টনে নিট কাপড় রং করতে যন্ত্রগুলোর সঙ্গে শ্রমিকেরা সাধারণত মহাব্যস্ত সময় পার করেন।

গ্যাস-সংকটের কারণে ৯ দিন ধরে এই কারখানায় পুরোপুরি নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক কবীর আহমেদ। তিনি জানান, দিনে ১১০ টন কাপড় ডাইংয়ের সক্ষমতা থাকলেও গত তিন মাস গ্যাস-সংকটের কারণে ৮০ থেকে ৮৫ টনের মতো কাপড় রং করা গেছে। কিন্তু ৮ জানুয়ারি থেকে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। ফলে টানা ৯ দিন ধরে কাপড় ডাইং বন্ধ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরীর এম এস ডাইং, প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানার মতো এই জেলার প্রায় সাড়ে চার শ শিল্পকারখানা বছরের শুরু থেকে তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি আরও দুই শিল্প এলাকা সাভার ও গাজীপুরের শ্রীপুরেও একই পরিস্থিতি। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে এসব এলাকার ডাইং কারখানা, সুতার কল বা স্পিনিং মিল, খাদ্যপণ্য, কাগজকলসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সেই তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে হবিগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহের ভালুকা ও চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলো। চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস পেলেও উৎপাদন মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারছে তারা।

এতে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানা বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয় করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। গ্যাসের এই সংকট শিগগিরই সমাধান না হলে শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের মতো ঘটনা বাড়বে বলে জানালেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। মোটামুটি ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পেলেও বড় ধরনের সংকট হয় না। কিন্তু এ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায় না। দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এলএনজি আনা হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই এখন দিনে ২৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে গ্যাসের সরবরাহ। দেখা গেছে, সরবরাহ কমলে নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার শিল্পকারখানা বেশি সংকটে পড়ে।

জানতে চাইলে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস-সংকট চরম অবস্থায় চলে গেছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার; গাজীপুরের শ্রীপুর ও সাভার এলাকায় সংকট বেশি। এসব এলাকার ডাইং কারখানাগুলো বেশি ভুগছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্যাস সমস্যা নিয়ে পেট্রোবাংলা কিংবা তিতাসের উচ্চপর্যায়ের কেউ কোনো কথা বলে না। এখন কাউকে ফোন দিলেও পাওয়া যায় না। বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত।’

সরেজমিন নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরে ফেয়ার অ্যাপারেলস নামের পোশাক কারখানার ভবনের নিচে ১৪টি বড় এলপিজি সিলিন্ডার বসানো হয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলতে থাকায় কারখানার আয়রন চালাতে এমন ব্যবস্থা করে নিয়েছে মালিকপক্ষ। যদিও গ্যাস-সংকটের কারণে তাদের ডাইং ইউনিটের উৎপাদন ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

ফেয়ার অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ডাইং ইউনিটে দিনে ৩০ টন কাপড় ডাইং করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু গ্যাস-সংকটের কারণে ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি ডাইং করতে পেরেছি যথাক্রমে ৭, ৬ ও ৭ টন। রাতে অল্প গ্যাস ও ডেসার বিদ্যুৎ ব্যবহারে এটুকু উৎপাদন করা যাচ্ছে। অথচ বর্তমানে আমাদের পোশাক কারখানায় প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ টন কাপড় দরকার।’

মোহাম্মদ কাশেম আরও জানান, এই গ্যাস-সংকটের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-সংকট চলছে। কখনো কম, কখনো বেশি। ফলে সক্ষমতা অনুযায়ী তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ নেওয়া যাচ্ছে না। আর কাজ না থাকায় গত ছয় মাসে অন্তত ৫০০ কর্মীকে বাদ দিতে হয়েছে।