ঢাকা ০২:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি ::
আমাদের নিউজপোর্টালে আপনাকে স্বাগতম... সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে...

রাজনীতির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে রাইসির মৃত্যুতে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৬:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ জুন ২০২৪ ২৩ বার পড়া হয়েছে

ইরানের নির্বাচনে অতিরক্ষণশীল অভিভাবক পরিষদের কঠোর তদারকি সব সময়ই থাকে। সব ধরনের নির্বাচনেই তাদের নিজস্ব পছন্দের প্রার্থী থাকেন। তা সত্ত্বেও ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগপর্যন্ত দেখা গেছে, মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থীরা পার্লামেন্টে কমবেশি প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন।

কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক স্তরে এবং এমনকি দ্বিতীয় স্তরে মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করা করা হয়। ফলে অনিবার্যভাবে ভোটারদের একটা বড় অংশ, যাঁরা আশা করেন ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব, তাঁরা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পড়ে। ১৯৭৯ সালে ইরান প্রজাতন্ত্র হওয়ার পর সবচেয়ে কম ভোট পড়ে সেই নির্বাচনে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান রক্ষণশীলেরা।

নির্বাচনের এই ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছিলেন, ‘বদ্ধমূল প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও এই নির্বাচনে যথেষ্টসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন।’

চরমপন্থী অংশের সমর্থনে পরিচালিত ওয়েবসাইটগুলোতে প্রতিদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মধ্যপন্থী সরকারকে সমালোচনা করা হতো। পরমাণু চুক্তির ব্যর্থতার জন্য রুহানি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করেছে, এই বলে তারা সমালোচনা করত। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিল। এই সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলত, ‘সরকারকে ঐক্যবদ্ধ’ করার একটা পরিকল্পনা চলছে।

 

 

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে ২০২১ সালে ইব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগপর্যন্ত ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টই পুরোপুরি খামেনির অনুগত ছিলেন না। সরকারকে ঐক্যবদ্ধ করার কৌশলের অংশ হিসেবে মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী প্রধান নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে অভিভাবক কাউন্সিল। ফলে রাইসি নির্বাচনে জেতেন। রাইসি ছিলেন ইরানের ডিপ স্টেটের পছন্দের প্রার্থী।

২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণের হার ছিল ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন।

ক্ষয়ের বৃত্ত বড় হচ্ছে

ভোটের এই নিম্নহারের প্রবণতা এ বছর মার্চ মাসে প্রথম দফা পার্লামেন্ট নির্বাচনেও অব্যাহত ছিল। মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটার এতে ভোট দেন। ইরানের রাজনীতির উপকেন্দ্র তেহরানে ভোটার উপস্থিতির হার ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

এ মাসে হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়। তেহরানে উপযুক্ত ভোটারদের মাত্র ৭ শতাংশ ভোট দেন। মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তেহরান থেকে শীর্ষ প্রার্থী পার্লামেন্টে তাঁর সদস্যপদ নিশ্চিত করেন।

এই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বিপজ্জনক মাত্রায় কমে যাওয়ার ঘটনাটি কি ইরানের ডিপ স্টেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়? মার্চের নির্বাচন নিয়ে খামেনির মন্তব্য ছিল, ‘শত্রুরা চায়, ইরানে যেন একটা ম্যাড়মেড়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।…আমাদের প্রধান লক্ষ্য একটা সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ উৎসবমুখর নির্বাচন।’

ইরানের ডিপ স্টেটের কাছে নির্বাচন হলো, আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের বৈধতা প্রমাণের উপায়। কিন্তু ভোটার অংশগ্রহণের নাটকীয় হ্রাস সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে।

নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের এই অনীহার আরেকটি ভিন্ন পটভূমিও রয়েছে। সেটা হলো দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ তীব্র হচ্ছে। অসন্তোষের এই পরিবেশ যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সংস্কার আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা মোহাম্মদ খাতামির অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত বেশ বড় রকমের বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। খাতামি এমন একজন নেতা, যিনি সব সময়ই ভোটের মাধ্যমে সংস্কার আনার পক্ষে ওকালতি করে আসছেন। কিন্তু এখন তিনি নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকার কথা বলছেন।

 

বদলে যেতে পারে সমীকরণ

যাহোক, ওপরের সব সমীকরণ বদলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমনটাও হতে পারে আলী রেজা আরাফি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। আলী রেজা ইরানের সব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনোনয়নের জন্য ৮৮ সদস্যের যে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট রয়েছে, তার সদস্য তিনি।

এ মাসের শুরুর দিকে আমি একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম, খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে রাইসি ও আরাফি প্রধান দুই প্রার্থী।

 

২৪ মে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ধর্মীয় কয়েকটি সংগঠন আরাফিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও আরাফি সেই অনুরোধ একটিমাত্র শব্দ, ‘না’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন।

তারপরও পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা থেকেই যায়। সেটা যদি ঘটে, তাহলে রক্ষণশীল প্রার্থীরা তাঁদের নাম প্রত্যাহার করে নেবেন। আর মধ্যপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। ২০২১ সালে রাইসির বিজয় একইভাবে নিশ্চিত করেছিল অভিভাবক পরিষদ।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রাজনীতির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে রাইসির মৃত্যুতে

আপডেট সময় : ০১:২৬:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ জুন ২০২৪

ইরানের নির্বাচনে অতিরক্ষণশীল অভিভাবক পরিষদের কঠোর তদারকি সব সময়ই থাকে। সব ধরনের নির্বাচনেই তাদের নিজস্ব পছন্দের প্রার্থী থাকেন। তা সত্ত্বেও ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগপর্যন্ত দেখা গেছে, মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থীরা পার্লামেন্টে কমবেশি প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন।

কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক স্তরে এবং এমনকি দ্বিতীয় স্তরে মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করা করা হয়। ফলে অনিবার্যভাবে ভোটারদের একটা বড় অংশ, যাঁরা আশা করেন ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব, তাঁরা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পড়ে। ১৯৭৯ সালে ইরান প্রজাতন্ত্র হওয়ার পর সবচেয়ে কম ভোট পড়ে সেই নির্বাচনে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান রক্ষণশীলেরা।

নির্বাচনের এই ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছিলেন, ‘বদ্ধমূল প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও এই নির্বাচনে যথেষ্টসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন।’

চরমপন্থী অংশের সমর্থনে পরিচালিত ওয়েবসাইটগুলোতে প্রতিদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মধ্যপন্থী সরকারকে সমালোচনা করা হতো। পরমাণু চুক্তির ব্যর্থতার জন্য রুহানি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করেছে, এই বলে তারা সমালোচনা করত। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিল। এই সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলত, ‘সরকারকে ঐক্যবদ্ধ’ করার একটা পরিকল্পনা চলছে।

 

 

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে ২০২১ সালে ইব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগপর্যন্ত ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টই পুরোপুরি খামেনির অনুগত ছিলেন না। সরকারকে ঐক্যবদ্ধ করার কৌশলের অংশ হিসেবে মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী প্রধান নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে অভিভাবক কাউন্সিল। ফলে রাইসি নির্বাচনে জেতেন। রাইসি ছিলেন ইরানের ডিপ স্টেটের পছন্দের প্রার্থী।

২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণের হার ছিল ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন।

ক্ষয়ের বৃত্ত বড় হচ্ছে

ভোটের এই নিম্নহারের প্রবণতা এ বছর মার্চ মাসে প্রথম দফা পার্লামেন্ট নির্বাচনেও অব্যাহত ছিল। মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটার এতে ভোট দেন। ইরানের রাজনীতির উপকেন্দ্র তেহরানে ভোটার উপস্থিতির হার ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

এ মাসে হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়। তেহরানে উপযুক্ত ভোটারদের মাত্র ৭ শতাংশ ভোট দেন। মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তেহরান থেকে শীর্ষ প্রার্থী পার্লামেন্টে তাঁর সদস্যপদ নিশ্চিত করেন।

এই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বিপজ্জনক মাত্রায় কমে যাওয়ার ঘটনাটি কি ইরানের ডিপ স্টেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়? মার্চের নির্বাচন নিয়ে খামেনির মন্তব্য ছিল, ‘শত্রুরা চায়, ইরানে যেন একটা ম্যাড়মেড়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।…আমাদের প্রধান লক্ষ্য একটা সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ উৎসবমুখর নির্বাচন।’

ইরানের ডিপ স্টেটের কাছে নির্বাচন হলো, আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের বৈধতা প্রমাণের উপায়। কিন্তু ভোটার অংশগ্রহণের নাটকীয় হ্রাস সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে।

নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের এই অনীহার আরেকটি ভিন্ন পটভূমিও রয়েছে। সেটা হলো দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ তীব্র হচ্ছে। অসন্তোষের এই পরিবেশ যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সংস্কার আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা মোহাম্মদ খাতামির অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত বেশ বড় রকমের বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। খাতামি এমন একজন নেতা, যিনি সব সময়ই ভোটের মাধ্যমে সংস্কার আনার পক্ষে ওকালতি করে আসছেন। কিন্তু এখন তিনি নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকার কথা বলছেন।

 

বদলে যেতে পারে সমীকরণ

যাহোক, ওপরের সব সমীকরণ বদলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমনটাও হতে পারে আলী রেজা আরাফি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। আলী রেজা ইরানের সব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনোনয়নের জন্য ৮৮ সদস্যের যে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট রয়েছে, তার সদস্য তিনি।

এ মাসের শুরুর দিকে আমি একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম, খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে রাইসি ও আরাফি প্রধান দুই প্রার্থী।

 

২৪ মে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ধর্মীয় কয়েকটি সংগঠন আরাফিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও আরাফি সেই অনুরোধ একটিমাত্র শব্দ, ‘না’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন।

তারপরও পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা থেকেই যায়। সেটা যদি ঘটে, তাহলে রক্ষণশীল প্রার্থীরা তাঁদের নাম প্রত্যাহার করে নেবেন। আর মধ্যপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। ২০২১ সালে রাইসির বিজয় একইভাবে নিশ্চিত করেছিল অভিভাবক পরিষদ।