ঢাকা ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি ::
আমাদের নিউজপোর্টালে আপনাকে স্বাগতম... সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে...

বই হোক মেধা বিকাশের আনন্দময় সঙ্গী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫১:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ১২১ বার পড়া হয়েছে

আকাশের উদারতা, সমুদ্রের বিশালতা, প্রকৃতির সোন্দর্যতা ফুলের স্নিগ্ধতা আর স্বর্গের অপার শান্তিময় মধুরতা সব কিছুর একত্রিত অপরূপ তূপ্তির নামই হলও বই পড়া। জগতের সব সফলতা, বিফলতা, সুখ-দুঃখ পারিপার্শিক পরিবর্তন পরিবর্ধন সংযোজন-বিয়োজন সব কিছুরই মিলনস্থল হলো বইয়ের পাতা। বইয়ের প্রতিটি পাতায় শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান পাণ্ডিত্য বিচক্ষণতারই পিরামিড রচিত হয় না, রচিত হয় মানবতা, সভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধের কঠিন গাঁথুনি।

শিশুতোষ থেকে শুরু করে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক সব ধরনের সম্পর্ক ও কার্যকারিতার সব উপাদান সযতনে সংরক্ষিত আছে মহামূল্যবান বইয়ের পাতাজুড়ে। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার যুগে বিজ্ঞানের যে বিকাশ ও প্রায়োগিক ব্যবহার সব কিছুই নৈপুণ্যে বিধিত আছে বইয়ের পাতায়।

বই পড়লেই পরিচ্ছন্নভাবে বুঝা যায় পরমাণু-অণুর কার্যক্রম হতে বৈমানিকের ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি, উড়োজাহাজ, নৌজাহাজ, সাব মেরিনসহ সব মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ব্যবহারের দক্ষ ও পরিপূর্ণ বর্ণনা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ পৃথিবীতে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সব জীবিত প্রণি ও উদ্ভিদের বিস্ময়কর অতি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বইয়ের পাতায়।

বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই আমরা পেতে পারি জীবের জিনগত সব তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক উপাত্ত; যা দিয়ে বর্তমান বিশ্ব মানব জাতিকে চমকে দেওয়ার মতো অনেক ঘটনার জন্মদানে সক্ষম হয়েছে। এত কিছুর সমাহার যে গ্রন্থে তা কিনে কেন এবং কীভাবে মানুষ দেউলিয়া হবে? মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত সব উদ্ভাবনীর মিলিত সমাহারই হলো বই। পৃথিবীর সব আবিষ্কার ও উদ্ভাবনীর উদঘাটন তখনই সম্ভব যখন বইয়ের পাতায় নিবিষ্ঠ মনে মনোনিবেশ করা যায়।

আমরা বাঙালি, আমাদের প্রাণের মিলনমেলার নামই বইমেলা। হৃদয়ের সব পিপাসা নিবারণের এক অপূর্ব মিলনায়তন। আধুনিকতার দুর্দান্ত থাবা আজ মোবাইল নামক ভয়ংকর এক ডিভাইস আমাদের উদীয়মান জাতিকে বইবিমুখ করে ফেলেছে। ফেসবুকসহ সকল অ্যাপস শিশুসন্তান হতে শুরু করে সব বয়সের মানুষকে এক নিদারণ আসক্তিতে ঘিরে ফেলেছে। আমরা স্কুল-কলেজ পড়ার সময় তিন গোয়েন্দা, ফেলুদা, সাইন্স ফিকশনসহ শিশুতোষ বইগুলো আমাদের বালিশের নিচেই থাকত।
মা ভাত বেড়ে বারবার ডেকেও বই হতে উঠাতে ব্যর্থ হতেন। নতুন নতুন ঘটনা প্রবাহ আমাদের অমীয় ভালোবাসা, তীব্র মুগ্ধতা আর প্রচ- অনুসন্ধিৎসায় আবদ্ধ করে রাখত। এমন ভালোলাগা, ভালোবাসা আর মুগ্ধতা বন্ধুবান্ধবের সাথে শেয়ার করার যে অনুভূতি তা বুদ্ধিদীপ্ত অতি শক্তিশালী জাতি গঠনে টনিকের মতো কাজ করতো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার। তেমনই একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে; গ্রহণশক্তি ধারণাশক্তি চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বল লাভ করে।’

এই লেখাটির মহত্ত্ব তাৎপর্য এত বেশি তা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেছি। রবিঠাকুরের শেষের কবিতায় লাবণ্যর কাকিমার মুখে যখন উচ্চারিত হয় ‘বই পড়া মেয়ে এত সহজে ভেঙে পরতে পারে না’ তখন মনের জোসের যে পারদ তার ঊর্ধ্বগতি পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পরে। এমনি করে একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি যখন প্রথিতযশা লেখক-লেখিকার বই বিছানায় ছড়ানো থাকতো গভীর তৃপ্তি আর এক অজানা ভালোলাগা কাজ করত মনে। আমরা মুখিয়া থাকতাম বইমেলায় নতুন বই মেলায় নতুন বইয়ের অপেক্ষায় আমরা আজ অতি দামি দামি ডিভাইস কিনে দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কি অন্ধকারের অতল গভীরে বিলীন হতে দিচ্ছি।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসের যে আসক্তিতা আমাদের উঠতি বয়সের বাচ্চাদের মেধা বিকাশের পরিবর্তে অনামিশার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি কিনা। যে বাচ্চার একাডেমিক বইয়ের পাশে শোভা পাবে প্রখ্যাত লেখকের নানান ধরনের উদ্ভাবনী ও প্রগতিশীল বই। রুচিশীলতা ও বিখ্যাৎ ব্যক্তিবর্গের জীবন আলেখ্যতায় বিমুগ্ধ হয়ে বাচ্চারা ওই ব্যক্তির কর্মময় জীবনের প্রতিটি স্তর অনুসরণ করে নিজেকে নিমগ্ন রাখবে মানবতা আর মানবিক মূল্যবোধ অর্জনে। উন্নতি আর প্রগতির সোপানে আরোহণের সব পথ উন্মুক্ত করতেই নিজের ধ্যান জ্ঞান আর চিন্তার সকল সফল ব্যবহার করবে; কিন্তু আজ এ কি সর্বনাশা টিকটক, কিশোর গ্যাং, মাত্রাতিক্তি ডিভাইস আসক্তি আর উদ্ভট উদ্ভট চিন্তাভাবনার চরিত্রকে রোল মডেল হিসাবে গ্রহণ করে অতি উর্বর ও তেজদ্বীপ্ত প্রতিভাকে বিপথে পরিচালিত করছে। নিমজ্জিত হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত কর্মকা-ে। ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। প্রগতিশীল বিশ্বে যেখানে কর্মতৎপরতায় প্রতিযোগিতা চলছে।

উন্নত দেশগুলো যেখানে নিত্যনতুন উদ্ভাবনীতে ব্যস্ত মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি সমস্যার সহজ ও দ্রুত সমাধানের পথ আবিষ্কারে, সেখানে গতিময় সৃজনশীলতায় ভরপুর করে তোলায় নিমগ্ন এই গ্লোবাল ভিলেজের উন্নত দেশগুলো। আর সেখানে আজ আমাদের প্রজন্ম ডিভাইস সর্বস্ব হয়েই পড়ে থাকবে? না তা হতে পারে না। বাঙালি জাতি গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্য তা বলে না। যাদের পূর্বপুরুষ অতি শক্তিশালী বিশ^নন্দিত। যাদের মনোবল আকাশচুম্বী, যাদের শির অতিম উচুঁতে তারা কখনই অনর্থক সময় নষ্ট করতে পারে না।

আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃত প্রাপ্ত জাতি আমরা। মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকৃত গৌরবান্বিত জাতি আমরা। বাংলা একাডেমি আমাদের ভাষার তীর্থস্থান। বইমেলাতে সকল প্রকার বইয়ের যে মহাসমাহার তা হতে কেন আমার হৃদয়ের খোরাক জোগাড় করে পরিতৃপ্তি লাভ করব না। সকল সৃজনশীলতায় অকৃত্রিম সমন্বয় হলো বইমেলা।

সব লেখক ও গবেষক তাদের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে অতি যতনে তাদের সৃষ্টিশীলতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেন অতিব শৈল্পিকভাবে। আমরা প্রত্যকেই যেন তাদের এই অদম্য কর্মস্প্রেহাকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি- তাদের শৈল্পিক সৃষ্টির অবগাহনে।

কবি ওমর খৈয়ম ‘যেমন লিখেছিলেন-

‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে
কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়’।

চির যৌবনা, অপরিসীম সৌন্দর্য আয়তনা বই শুধু যে মানব সন্তানের সর্বাত্মক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণই করে না, উদ্বুদ্ধ করে নতুন নতুন চিন্তা ও পিপাসা সৃষ্টি করতে। মানুষের আশা আকাক্সক্ষা প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে পূরণে যেমন একজন অকৃত্রিম বন্ধু বা সঙ্গী অত্যাবশ্যক, প্রচলিত অভ্যাসে আমরা যেমন অবলীলায় বলে থাকি সব সফল পুরুষের সাফল্যেও পেছনেই রয়েছে একজন সফল সঙ্গিনী; কিন্তু অনেক সময় সেই সফল সঙ্গিনীরও ভুল হতে পারে। কোনো কারণে প্রিয়তমার ভালোবাসায় ছেদও পড়তে পারে; কিন্তু একটি ভালো বই কখনই ভুল করেত পারে না। ভুল পথ নির্দেশনা দিতে পারে, পারে না বিশ্বাসঘাতকতা করতে। তাই চির বিশ্বস্ত বন্ধুই হলো একটি ভালো বই।

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কীটতত্ত্ব বিভাগ
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বই হোক মেধা বিকাশের আনন্দময় সঙ্গী

আপডেট সময় : ০৮:৫১:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

আকাশের উদারতা, সমুদ্রের বিশালতা, প্রকৃতির সোন্দর্যতা ফুলের স্নিগ্ধতা আর স্বর্গের অপার শান্তিময় মধুরতা সব কিছুর একত্রিত অপরূপ তূপ্তির নামই হলও বই পড়া। জগতের সব সফলতা, বিফলতা, সুখ-দুঃখ পারিপার্শিক পরিবর্তন পরিবর্ধন সংযোজন-বিয়োজন সব কিছুরই মিলনস্থল হলো বইয়ের পাতা। বইয়ের প্রতিটি পাতায় শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান পাণ্ডিত্য বিচক্ষণতারই পিরামিড রচিত হয় না, রচিত হয় মানবতা, সভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধের কঠিন গাঁথুনি।

শিশুতোষ থেকে শুরু করে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক সব ধরনের সম্পর্ক ও কার্যকারিতার সব উপাদান সযতনে সংরক্ষিত আছে মহামূল্যবান বইয়ের পাতাজুড়ে। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার যুগে বিজ্ঞানের যে বিকাশ ও প্রায়োগিক ব্যবহার সব কিছুই নৈপুণ্যে বিধিত আছে বইয়ের পাতায়।

বই পড়লেই পরিচ্ছন্নভাবে বুঝা যায় পরমাণু-অণুর কার্যক্রম হতে বৈমানিকের ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি, উড়োজাহাজ, নৌজাহাজ, সাব মেরিনসহ সব মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ব্যবহারের দক্ষ ও পরিপূর্ণ বর্ণনা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ পৃথিবীতে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সব জীবিত প্রণি ও উদ্ভিদের বিস্ময়কর অতি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বইয়ের পাতায়।

বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই আমরা পেতে পারি জীবের জিনগত সব তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক উপাত্ত; যা দিয়ে বর্তমান বিশ্ব মানব জাতিকে চমকে দেওয়ার মতো অনেক ঘটনার জন্মদানে সক্ষম হয়েছে। এত কিছুর সমাহার যে গ্রন্থে তা কিনে কেন এবং কীভাবে মানুষ দেউলিয়া হবে? মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত সব উদ্ভাবনীর মিলিত সমাহারই হলো বই। পৃথিবীর সব আবিষ্কার ও উদ্ভাবনীর উদঘাটন তখনই সম্ভব যখন বইয়ের পাতায় নিবিষ্ঠ মনে মনোনিবেশ করা যায়।

আমরা বাঙালি, আমাদের প্রাণের মিলনমেলার নামই বইমেলা। হৃদয়ের সব পিপাসা নিবারণের এক অপূর্ব মিলনায়তন। আধুনিকতার দুর্দান্ত থাবা আজ মোবাইল নামক ভয়ংকর এক ডিভাইস আমাদের উদীয়মান জাতিকে বইবিমুখ করে ফেলেছে। ফেসবুকসহ সকল অ্যাপস শিশুসন্তান হতে শুরু করে সব বয়সের মানুষকে এক নিদারণ আসক্তিতে ঘিরে ফেলেছে। আমরা স্কুল-কলেজ পড়ার সময় তিন গোয়েন্দা, ফেলুদা, সাইন্স ফিকশনসহ শিশুতোষ বইগুলো আমাদের বালিশের নিচেই থাকত।
মা ভাত বেড়ে বারবার ডেকেও বই হতে উঠাতে ব্যর্থ হতেন। নতুন নতুন ঘটনা প্রবাহ আমাদের অমীয় ভালোবাসা, তীব্র মুগ্ধতা আর প্রচ- অনুসন্ধিৎসায় আবদ্ধ করে রাখত। এমন ভালোলাগা, ভালোবাসা আর মুগ্ধতা বন্ধুবান্ধবের সাথে শেয়ার করার যে অনুভূতি তা বুদ্ধিদীপ্ত অতি শক্তিশালী জাতি গঠনে টনিকের মতো কাজ করতো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার। তেমনই একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে; গ্রহণশক্তি ধারণাশক্তি চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বল লাভ করে।’

এই লেখাটির মহত্ত্ব তাৎপর্য এত বেশি তা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেছি। রবিঠাকুরের শেষের কবিতায় লাবণ্যর কাকিমার মুখে যখন উচ্চারিত হয় ‘বই পড়া মেয়ে এত সহজে ভেঙে পরতে পারে না’ তখন মনের জোসের যে পারদ তার ঊর্ধ্বগতি পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পরে। এমনি করে একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি যখন প্রথিতযশা লেখক-লেখিকার বই বিছানায় ছড়ানো থাকতো গভীর তৃপ্তি আর এক অজানা ভালোলাগা কাজ করত মনে। আমরা মুখিয়া থাকতাম বইমেলায় নতুন বই মেলায় নতুন বইয়ের অপেক্ষায় আমরা আজ অতি দামি দামি ডিভাইস কিনে দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কি অন্ধকারের অতল গভীরে বিলীন হতে দিচ্ছি।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসের যে আসক্তিতা আমাদের উঠতি বয়সের বাচ্চাদের মেধা বিকাশের পরিবর্তে অনামিশার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি কিনা। যে বাচ্চার একাডেমিক বইয়ের পাশে শোভা পাবে প্রখ্যাত লেখকের নানান ধরনের উদ্ভাবনী ও প্রগতিশীল বই। রুচিশীলতা ও বিখ্যাৎ ব্যক্তিবর্গের জীবন আলেখ্যতায় বিমুগ্ধ হয়ে বাচ্চারা ওই ব্যক্তির কর্মময় জীবনের প্রতিটি স্তর অনুসরণ করে নিজেকে নিমগ্ন রাখবে মানবতা আর মানবিক মূল্যবোধ অর্জনে। উন্নতি আর প্রগতির সোপানে আরোহণের সব পথ উন্মুক্ত করতেই নিজের ধ্যান জ্ঞান আর চিন্তার সকল সফল ব্যবহার করবে; কিন্তু আজ এ কি সর্বনাশা টিকটক, কিশোর গ্যাং, মাত্রাতিক্তি ডিভাইস আসক্তি আর উদ্ভট উদ্ভট চিন্তাভাবনার চরিত্রকে রোল মডেল হিসাবে গ্রহণ করে অতি উর্বর ও তেজদ্বীপ্ত প্রতিভাকে বিপথে পরিচালিত করছে। নিমজ্জিত হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত কর্মকা-ে। ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। প্রগতিশীল বিশ্বে যেখানে কর্মতৎপরতায় প্রতিযোগিতা চলছে।

উন্নত দেশগুলো যেখানে নিত্যনতুন উদ্ভাবনীতে ব্যস্ত মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি সমস্যার সহজ ও দ্রুত সমাধানের পথ আবিষ্কারে, সেখানে গতিময় সৃজনশীলতায় ভরপুর করে তোলায় নিমগ্ন এই গ্লোবাল ভিলেজের উন্নত দেশগুলো। আর সেখানে আজ আমাদের প্রজন্ম ডিভাইস সর্বস্ব হয়েই পড়ে থাকবে? না তা হতে পারে না। বাঙালি জাতি গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্য তা বলে না। যাদের পূর্বপুরুষ অতি শক্তিশালী বিশ^নন্দিত। যাদের মনোবল আকাশচুম্বী, যাদের শির অতিম উচুঁতে তারা কখনই অনর্থক সময় নষ্ট করতে পারে না।

আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃত প্রাপ্ত জাতি আমরা। মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকৃত গৌরবান্বিত জাতি আমরা। বাংলা একাডেমি আমাদের ভাষার তীর্থস্থান। বইমেলাতে সকল প্রকার বইয়ের যে মহাসমাহার তা হতে কেন আমার হৃদয়ের খোরাক জোগাড় করে পরিতৃপ্তি লাভ করব না। সকল সৃজনশীলতায় অকৃত্রিম সমন্বয় হলো বইমেলা।

সব লেখক ও গবেষক তাদের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে অতি যতনে তাদের সৃষ্টিশীলতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেন অতিব শৈল্পিকভাবে। আমরা প্রত্যকেই যেন তাদের এই অদম্য কর্মস্প্রেহাকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি- তাদের শৈল্পিক সৃষ্টির অবগাহনে।

কবি ওমর খৈয়ম ‘যেমন লিখেছিলেন-

‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে
কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়’।

চির যৌবনা, অপরিসীম সৌন্দর্য আয়তনা বই শুধু যে মানব সন্তানের সর্বাত্মক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণই করে না, উদ্বুদ্ধ করে নতুন নতুন চিন্তা ও পিপাসা সৃষ্টি করতে। মানুষের আশা আকাক্সক্ষা প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে পূরণে যেমন একজন অকৃত্রিম বন্ধু বা সঙ্গী অত্যাবশ্যক, প্রচলিত অভ্যাসে আমরা যেমন অবলীলায় বলে থাকি সব সফল পুরুষের সাফল্যেও পেছনেই রয়েছে একজন সফল সঙ্গিনী; কিন্তু অনেক সময় সেই সফল সঙ্গিনীরও ভুল হতে পারে। কোনো কারণে প্রিয়তমার ভালোবাসায় ছেদও পড়তে পারে; কিন্তু একটি ভালো বই কখনই ভুল করেত পারে না। ভুল পথ নির্দেশনা দিতে পারে, পারে না বিশ্বাসঘাতকতা করতে। তাই চির বিশ্বস্ত বন্ধুই হলো একটি ভালো বই।

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কীটতত্ত্ব বিভাগ
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), ঢাকা।