ঢাকা ১২:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি ::
আমাদের নিউজপোর্টালে আপনাকে স্বাগতম... সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে...

এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৬:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ মে ২০২৪ ২৬ বার পড়া হয়েছে

ইরানের রাষ্ট্রপতি এব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পরপরই রোববার ইসরায়েলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে।

সোমবার ওই হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাইসি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদোল্লাহিয়ান এবং তাদের সহযাত্রীদের মৃত্যুর বিষয়টা নিশ্চিত করা হলে প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।

হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ওই দেশের নাগরিকদের কেউ কেউ।

সাম্প্রতিক কালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘাত দেখা গিয়েছে।

প্রথমে, সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেটে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়। এরপর এর প্রতিশোধ হিসেবে গত এপ্রিল মাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের উপর হামলা চালায় ইরান।

এই সংঘাতের মাঝেই ইরানের রাষ্ট্রপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় কেউ কেউ ইসরায়েলকেও সন্দেহ করছেন।

তবে এই ঘটনায় তাদের হাত থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছে ইসরায়েল।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে প্রকাশ না করার শর্তে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মি. রাইসির হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত নয়।

তবে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

এই প্রতিবেদনে আমরা এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবর এবং আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে তোলা প্রশ্নগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করব।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ
ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার ঘটনায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, “এই হৃদয়বিদারক এই ঘটনার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে কোনও বিমান বিক্রি করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।”

“এই কারণে প্রেসিডেন্ট এবং তার সহযোগীদের শহীদ হতে হলো। আমেরিকার এই অপরাধ ইরানের জনগণের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।”

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের পক্ষ থেকে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল আমেরিকার কাছ। কিন্তু অভিযোগ করা হচ্ছে তাতে রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার সোমবার বলেছেন, “ইরান সরকার আমাদের সাহায্য চেয়েছিল। ইরান সরকারকে জানানো হয়েছিল যে আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত। যেমনটা আমরা কোনও বিদেশি সরকার সাহায্য চাইলে করে থাকি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লজিস্টিক্সের কারণে আমরা সাহায্য করতে পারিনি।”

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারে এই বিষয় নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন কি না?

এর জবাবে তিনি জানিয়েছেন, এই হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আমেরিকার কোনও ভূমিকা ছিল না।

মার্কিন সেনেটর চাক শুমার সোমবার বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গিয়েছে যে এই ঘটনায় ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই।

ইসরায়েলের গণমাধ্যম কী বলছে?
টাইমস অব ইসরায়েল তাদের প্রতিবেদন শুরু করেছে একটি বিবৃতি দিয়ে, যেখানে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে ইসরায়েলের কোনও সম্পর্ক নেই।

এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসরাইলের বিরোধী দলনেতা আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, মি. রাইসির মৃত্যুতে ইসরাইলের নীতির কোনও পরিবর্তন হওয়ার আশা নেই।

তিনি বলেন, “এটা (রাইসির মৃত্যু) আমাদের কাছে কোনো বিষয় নয়। এটা ইসরায়েলের মনোভাবের উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। ইরানের নীতি নির্ধারণ করেন সে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি।”

“তবে রাইসি যে একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার মৃত্যুতে আমরা চোখের জল ফেলব না।”

ওই প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপমন্ত্রী এভি মাওজ বলেন, “এক মাস আগেও ওরা হুমকি দিয়ে বলেছিল, ইসরায়েল আক্রমণ করলে তাদের (ইসরায়েলের) নিস্তার নেই। এখন তারা নিজেরাই ইতিহাসের ধুলোকণায় পরিণত হয়েছে।”

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এমন অনেকের মন্তব্য উল্লেখ করেছেন যারা ইরানের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুকে ইসরাইলের জন্য ‘সুসংবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইসরায়েলের ব্যাত ইয়াম শহরে এক ধর্মীয় নেতা তার ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ইহুদি সপ্তাহে যে প্রার্থনা করা হয় তা যেন তারা পাঠ না করে। উদযাপনের সময় বা ইহুদি উৎসবে চলাকালীন এই প্রার্থনা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই প্রতিবেদনে এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর নাচ, গান করার ঘটনার বিষয়েও লেখা হয়েছে।

‘তেহরানের কসাই’
ইয়াই নেট নিউজ ওয়েবসাইট ইব্রাহিম রাইসির উত্থানের বিষয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম ‘তেহরানের কসাই’।

অন্য একটি প্রতিবেদনে ওয়েবসাইটটির শিরোনাম ছিল ‘ইরানের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তির মৃত্যু’।

মতামত ভিত্তিক কলামে লেখা হয়েছে যে মি. রাইসির মৃত্যুতে কারও চোখ থেকে সত্যিকারের জল পড়বে না। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হত্যালীলার কারণে প্রবীণ প্রজন্মের মনে তাকে নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, হিজাবের বিষয়ে মি রাইসির কঠোর মনোভাবের কারণে নারীরা তাকে ঘৃণা করেন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডও তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখত।

মি. রাইসি ইসলামি বিপ্লবের পর বিচার বিভাগে কাজ শুরু করেন এবং বিভিন্ন শহরে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি বিচারকও হন।

১৯৮৮ সালে গঠিত এক ট্রাইব্যুনালের অংশ ছিলেন। ‘ঘাতক কমিটি’ নামে পরিচিত ছিল ওই ট্রাইব্যুনাল।

হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিদের ‘পুনর্বিচার’ বিচার করেছিল এই ট্রাইব্যুনাল। অভিযুক্তরা কিন্তু ইতিমধ্যে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কারাগারে সাজা কাটছিলেন।

ঠিক কতজনকে ওই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০০ পুরুষ ও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।

তাদের গণসমাধি দেওয়া হয়। এই পুরো ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে বিবেচনা করেন মানবাধিকারকর্মীরা।

ইসলামি এই প্রজাতন্ত্রের নেতারা ওই গণহত্যার কথা অস্বীকার করেন না। তবে সেইসব ঘটনার বিস্তারিত বা বৈধতার বিষয় তারা কখনও আলোচনাও করেন না।

ওই মৃত্যুদণ্ডে তার ভূমিকার কথা অবশ্য মি. রাইসি বারবার অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি একথাও বলেছেন যে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেনির জারি করা ফতোয়ার কারণে ওই মৃত্যুদণ্ডাদেশ যুক্তিসঙ্গত ছিল।

ইয়াই নেট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এব্রাহিম রাইসির মরদেহ তেহরানে নিয়ে আসা হলে কেউই সত্যিকারের চোখের জল ফেলবে না।

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে রাইসির মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়ের ছবি তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চিত্র
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে মিম শেয়ার করছে।

কোনও কোনও পোস্টে লেখা হয়েছে, তার হেলিকপ্টার চালাচ্ছিলেন এলি কপ্টার নামের এক মোসাদ এজেন্ট।

প্রসঙ্গত, এলি কোহেন ছিলেন একজন ইসরায়েলি গুপ্তচর। সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন যে সিরিয়ার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়া থেকে খুব দূরে ছিলেন না।

বলা হয়, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলের জয়ের পিছনে কোহেনের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ছিল।

সেই এলি কোহেনের নামই এখন উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে।

ইসরায়েলের ফরাসি ভাষার চ্যানেল আই-২৪ নিউজের সাংবাদিক ড্যানিয়েল হাইকও ‘এলি কপ্টার’ প্রসঙ্গ এনে কৌতুকের ছলে সংবাদ হিসাবে উপস্থাপনা করেছিলেন।

কিন্তু দর্শক এর সমালোচনা করলে চ্যানেলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয়।

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে উল্লাস করেছেন ইসরায়েলি নেতারা।

হেরিটেজ মন্ত্রী এমিচে এলিয়াহু এক্স-এ ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘চিয়ার্স’।

অন্য একটা টুইটে তিনি লেখেন- ‘সেই সব উন্মাদ মানুষ যারা গত রাত পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যু কামনা করছিল আর ডানপন্থীরা চাইছিল আমরা যেন ইরানের ওই হত্যাকারীর মৃত্যু উদযাপন না করি।’

এই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের কয়েকজন নেতার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

এই নেতারা রাইসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ না করার কথা বলেছেন এবং রাইসির পুরানো বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

আপডেট সময় : ১২:২৬:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ মে ২০২৪

ইরানের রাষ্ট্রপতি এব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পরপরই রোববার ইসরায়েলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে।

সোমবার ওই হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাইসি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদোল্লাহিয়ান এবং তাদের সহযাত্রীদের মৃত্যুর বিষয়টা নিশ্চিত করা হলে প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।

হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ওই দেশের নাগরিকদের কেউ কেউ।

সাম্প্রতিক কালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘাত দেখা গিয়েছে।

প্রথমে, সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেটে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়। এরপর এর প্রতিশোধ হিসেবে গত এপ্রিল মাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের উপর হামলা চালায় ইরান।

এই সংঘাতের মাঝেই ইরানের রাষ্ট্রপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় কেউ কেউ ইসরায়েলকেও সন্দেহ করছেন।

তবে এই ঘটনায় তাদের হাত থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছে ইসরায়েল।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে প্রকাশ না করার শর্তে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মি. রাইসির হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত নয়।

তবে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

এই প্রতিবেদনে আমরা এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবর এবং আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে তোলা প্রশ্নগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করব।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ
ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার ঘটনায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, “এই হৃদয়বিদারক এই ঘটনার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে কোনও বিমান বিক্রি করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।”

“এই কারণে প্রেসিডেন্ট এবং তার সহযোগীদের শহীদ হতে হলো। আমেরিকার এই অপরাধ ইরানের জনগণের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।”

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের পক্ষ থেকে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল আমেরিকার কাছ। কিন্তু অভিযোগ করা হচ্ছে তাতে রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার সোমবার বলেছেন, “ইরান সরকার আমাদের সাহায্য চেয়েছিল। ইরান সরকারকে জানানো হয়েছিল যে আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত। যেমনটা আমরা কোনও বিদেশি সরকার সাহায্য চাইলে করে থাকি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লজিস্টিক্সের কারণে আমরা সাহায্য করতে পারিনি।”

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারে এই বিষয় নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন কি না?

এর জবাবে তিনি জানিয়েছেন, এই হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আমেরিকার কোনও ভূমিকা ছিল না।

মার্কিন সেনেটর চাক শুমার সোমবার বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গিয়েছে যে এই ঘটনায় ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই।

ইসরায়েলের গণমাধ্যম কী বলছে?
টাইমস অব ইসরায়েল তাদের প্রতিবেদন শুরু করেছে একটি বিবৃতি দিয়ে, যেখানে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে ইসরায়েলের কোনও সম্পর্ক নেই।

এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসরাইলের বিরোধী দলনেতা আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, মি. রাইসির মৃত্যুতে ইসরাইলের নীতির কোনও পরিবর্তন হওয়ার আশা নেই।

তিনি বলেন, “এটা (রাইসির মৃত্যু) আমাদের কাছে কোনো বিষয় নয়। এটা ইসরায়েলের মনোভাবের উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। ইরানের নীতি নির্ধারণ করেন সে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি।”

“তবে রাইসি যে একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার মৃত্যুতে আমরা চোখের জল ফেলব না।”

ওই প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপমন্ত্রী এভি মাওজ বলেন, “এক মাস আগেও ওরা হুমকি দিয়ে বলেছিল, ইসরায়েল আক্রমণ করলে তাদের (ইসরায়েলের) নিস্তার নেই। এখন তারা নিজেরাই ইতিহাসের ধুলোকণায় পরিণত হয়েছে।”

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এমন অনেকের মন্তব্য উল্লেখ করেছেন যারা ইরানের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুকে ইসরাইলের জন্য ‘সুসংবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইসরায়েলের ব্যাত ইয়াম শহরে এক ধর্মীয় নেতা তার ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ইহুদি সপ্তাহে যে প্রার্থনা করা হয় তা যেন তারা পাঠ না করে। উদযাপনের সময় বা ইহুদি উৎসবে চলাকালীন এই প্রার্থনা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই প্রতিবেদনে এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর নাচ, গান করার ঘটনার বিষয়েও লেখা হয়েছে।

‘তেহরানের কসাই’
ইয়াই নেট নিউজ ওয়েবসাইট ইব্রাহিম রাইসির উত্থানের বিষয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম ‘তেহরানের কসাই’।

অন্য একটি প্রতিবেদনে ওয়েবসাইটটির শিরোনাম ছিল ‘ইরানের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তির মৃত্যু’।

মতামত ভিত্তিক কলামে লেখা হয়েছে যে মি. রাইসির মৃত্যুতে কারও চোখ থেকে সত্যিকারের জল পড়বে না। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হত্যালীলার কারণে প্রবীণ প্রজন্মের মনে তাকে নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, হিজাবের বিষয়ে মি রাইসির কঠোর মনোভাবের কারণে নারীরা তাকে ঘৃণা করেন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডও তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখত।

মি. রাইসি ইসলামি বিপ্লবের পর বিচার বিভাগে কাজ শুরু করেন এবং বিভিন্ন শহরে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি বিচারকও হন।

১৯৮৮ সালে গঠিত এক ট্রাইব্যুনালের অংশ ছিলেন। ‘ঘাতক কমিটি’ নামে পরিচিত ছিল ওই ট্রাইব্যুনাল।

হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিদের ‘পুনর্বিচার’ বিচার করেছিল এই ট্রাইব্যুনাল। অভিযুক্তরা কিন্তু ইতিমধ্যে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কারাগারে সাজা কাটছিলেন।

ঠিক কতজনকে ওই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০০ পুরুষ ও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।

তাদের গণসমাধি দেওয়া হয়। এই পুরো ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে বিবেচনা করেন মানবাধিকারকর্মীরা।

ইসলামি এই প্রজাতন্ত্রের নেতারা ওই গণহত্যার কথা অস্বীকার করেন না। তবে সেইসব ঘটনার বিস্তারিত বা বৈধতার বিষয় তারা কখনও আলোচনাও করেন না।

ওই মৃত্যুদণ্ডে তার ভূমিকার কথা অবশ্য মি. রাইসি বারবার অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি একথাও বলেছেন যে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেনির জারি করা ফতোয়ার কারণে ওই মৃত্যুদণ্ডাদেশ যুক্তিসঙ্গত ছিল।

ইয়াই নেট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এব্রাহিম রাইসির মরদেহ তেহরানে নিয়ে আসা হলে কেউই সত্যিকারের চোখের জল ফেলবে না।

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে রাইসির মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়ের ছবি তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চিত্র
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে মিম শেয়ার করছে।

কোনও কোনও পোস্টে লেখা হয়েছে, তার হেলিকপ্টার চালাচ্ছিলেন এলি কপ্টার নামের এক মোসাদ এজেন্ট।

প্রসঙ্গত, এলি কোহেন ছিলেন একজন ইসরায়েলি গুপ্তচর। সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন যে সিরিয়ার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়া থেকে খুব দূরে ছিলেন না।

বলা হয়, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলের জয়ের পিছনে কোহেনের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ছিল।

সেই এলি কোহেনের নামই এখন উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে।

ইসরায়েলের ফরাসি ভাষার চ্যানেল আই-২৪ নিউজের সাংবাদিক ড্যানিয়েল হাইকও ‘এলি কপ্টার’ প্রসঙ্গ এনে কৌতুকের ছলে সংবাদ হিসাবে উপস্থাপনা করেছিলেন।

কিন্তু দর্শক এর সমালোচনা করলে চ্যানেলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয়।

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে উল্লাস করেছেন ইসরায়েলি নেতারা।

হেরিটেজ মন্ত্রী এমিচে এলিয়াহু এক্স-এ ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘চিয়ার্স’।

অন্য একটা টুইটে তিনি লেখেন- ‘সেই সব উন্মাদ মানুষ যারা গত রাত পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যু কামনা করছিল আর ডানপন্থীরা চাইছিল আমরা যেন ইরানের ওই হত্যাকারীর মৃত্যু উদযাপন না করি।’

এই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের কয়েকজন নেতার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

এই নেতারা রাইসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ না করার কথা বলেছেন এবং রাইসির পুরানো বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

এব্রাহিম রাইসির মৃত্যু নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।